একাত্তর অস্বীকারের রাজনীতি শেষ হোক
একটি রাজনৈতিক দলের বর্তমান পরিচয় তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু তার অতীত মুছে দিতে পারে না। সময়ের সঙ্গে দল বদলায়, নেতৃত্ব বদলায়, রাজনৈতিক কৌশল বদলায়; এমনকি পুরোনো অবস্থান থেকেও সরে আসা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাসের নথি রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে ফেলার সুযোগ কোনো দলের নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে ১৯৭১-এর প্রশ্ন তাই নিছক অতীতের বিতর্ক নয়; এটি দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
কুষ্টিয়ায় ১৬ আগস্টের একটি সমাবেশে জামায়াতের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা ‘রাজাকার’ ও ‘আল-বদর’ শব্দকে ‘ভারতীয় নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উদ্ধৃতিটি সঠিক হয়ে থাকলে, এমন বক্তব্যের মাধ্যমে একটি জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়ের জবাব দেওয়া যায় না। বরং এতে ইতিহাসের মূল প্রশ্ন এড়িয়ে পুরো বিষয়টিকে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়।
১৯৭১-এর ইতিহাস কোনো একটি দেশ, সরকার, সংবাদমাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক দলের তৈরি একক বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নথি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য, পাকিস্তানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উৎস, গবেষণা, ঐতিহাসিক গ্রন্থ এবং বাংলাদেশের বিচারিক নথিতে ওই সময়ের বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে কোনো একটি শব্দ বা ঘটনাকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে এসব উৎসের সমন্বিত প্রমাণের জবাব দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমও এ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিলভান্ডার। কামারুজ্জামানের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আল-বদরকে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সশস্ত্র কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক এবং আল-বদর ও আল-শামস গঠনের বিষয়ও বিচারিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গোলাম আযমের মামলার রায়েও মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের কার্যক্রম এবং এসব কাঠামোর সঙ্গে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিস্তর প্রমাণ পরীক্ষা করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক থাকতে পারে। কেউ বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্নও তুলতে পারেন। কিন্তু সেই বিতর্কের কারণে আদালতে উপস্থাপিত ও পর্যালোচিত ঐতিহাসিক উপাদানগুলোকে নিছক ‘ভারতীয় নাটক’ বলে বাতিল করে দেওয়া যায় না।
প্রশ্নটি তাই সরল—যদি রাজাকার ও আল-বদরের ইতিহাস ‘ভারতের তৈরি’ হয়ে থাকে, তাহলে সেই ইতিহাসের কোন কোন অংশ ভারত তৈরি করেছিল? জামায়াতের ১৯৭১-এর রাজনৈতিক অবস্থান কি ভারত তৈরি করেছিল? পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে জামায়াতের অবস্থান কি ভারত বানিয়ে দিয়েছিল? ইসলামী ছাত্রসংঘের তৎকালীন ভূমিকা, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির যোগাযোগ কিংবা আল-বদর ও আল-শামসের অস্তিত্ব—এসবও কি ভারতীয় কল্পনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে নথির দিকে তাকাতে হবে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—কেউ অস্বীকার করলেও তার প্রমাণ বিভিন্ন উৎসে টিকে থাকে।
বাংলা পিডিয়ার মতো তথ্যসূত্রেও আল-বদরকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত একটি আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাধীনতার আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের ভূমিকার কথাও সেখানে আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রচারণার ফল নয়; এর ঐতিহাসিক ভিত্তি বহু পুরোনো।
আরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এটি এমন এক অধ্যায়, যার সঙ্গে অসংখ্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি জাতির গভীর শোক জড়িয়ে আছে। বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও বিচারিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
এই জায়গায় জামায়াতের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা দাবি করেছিলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, তখন পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার ও আল-বদরের সদস্যরা আত্মসমর্পণ কিংবা পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন; ফলে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারেননি।
এ ধরনের দাবি করার অধিকার রাজনৈতিকভাবে সবারই আছে। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত বিবরণকে উল্টে দেওয়ার মতো বক্তব্যের সঙ্গে শক্তিশালী প্রমাণও থাকা প্রয়োজন। নতুন কোনো দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা গবেষণা যদি এ দাবিকে সমর্থন করে, তা জনসমক্ষে উপস্থাপন করা যেতে পারে এবং তা নিয়ে গবেষণাও হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বহুল আলোচিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
এখানেই জামায়াতের বর্তমান রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি সামনে আসে। ২০২৫ সালের মে মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এ টি এম আজহারুল ইসলামকে খালাস দেওয়ার পর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব দল বা তার কর্মীদের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অক্টোবরে দলের শীর্ষ নেতা ১৯৪৭ সাল থেকে জামায়াতের কারণে সৃষ্ট যেকোনো কষ্টের জন্যও ক্ষমা চান এবং স্বীকার করেন যে ১৯৭১ সালে জামায়াত পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার বিরোধিতা করেছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করা উচিত ছিল।
এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দল হিসেবে অতীতের ভুল স্বীকার করা পরিবর্তনের ইতিবাচক লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু সাধারণ ক্ষমাপ্রার্থনা আর বিস্তারিত ঐতিহাসিক জবাবদিহি এক বিষয় নয়। ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন—কোন সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, কেন ভুল ছিল, সে সময় দলের সাংগঠনিক অবস্থান কী ছিল এবং ভবিষ্যতে সেই অবস্থ
