শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনামঃ
মেয়ের বিয়ের ‌‘যৌতুক’ হিসেবে বিসিএস প্রশ্ন দেন পিএসসির সাবেক মেম্বার মোহনপুরে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বকুলের অভিষেক আন্দোলনকারীকে ‘শিবির অ্যাখ্যা’ দিয়ে মারধরের অভিযোগ রাবি ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে রাজশাহীতে টহল গাড়ি থেকে ছিটকে পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু পুঠিয়ায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার উদ্বোধন কোটা বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে উত্তাল রাবি , আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক । রাবি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জয়পুরহাট জেলা সমিতির বৃক্ষরোপন ঐতিহ্যের ৭০ বছর পেরিয়ে ৭১-এ পদার্পণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি বাস্তবায়ন আলোচনা মোহনপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতকে মৃত ভেবে তুলে নিয়ে পালানোর সময় আটক ২

ঐতিহ্যের ৭০ বছর পেরিয়ে ৭১-এ পদার্পণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের

রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশিতঃ শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০২৪, ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন
RU

আজ ৬ জুলাই, ২০২৪ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ১৯৫৩ সালের এই দিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশকে বিভক্ত করে পাকিস্তান এবং ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেন। মূলত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার ভারত এবং পাকিস্তানকে বিভক্ত করেছিল। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাকিস্তানের একটি অংশ। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকায় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলেও আরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজশাহী শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রাজশাহীর ছাত্রসমাজ এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তৎকালীন রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তদানীন্তন “স্যাডলার কমিশন” রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রদান করেন। ফলে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে তথা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ শহর রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছাত্র সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে। পাকিস্তানের সৃষ্টি থেকেই ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি সোচ্চার হতে থাকে এবং ছাত্র সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের একটি সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেয়।
১৯৫৩ সালে ৬ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী শহরের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গনে এক সভায় মিলিত হয়ে সোচ্চার কণ্ঠে পাকিস্তানি সরকারকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাশ করে রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯৫৩ সালের ১৩ ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী ভুবন মোহন পার্কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র উত্তর অঞ্চলের মানুষের দাবির যৌক্তিকতাকে সামনে রেখেই আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৫৩ সালের ৩১শে মার্চ “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ” পাশ হয় এবং একই বছর ১৬ই জুন ঢাকা গেজেটের এক্সট্রা অর্ডিনারিতে প্রাদেশিক গভর্নরের সম্মতি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৫৩ সালের ৬ই জুলাই শিক্ষাবিদ ডঃ ইতরাৎ হোসেন জুবেরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিযুক্ত হন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
পদ্মার তীরে অবস্থিত বড়কুঠি নামে পরিচিত ঐতিহাসিক রেশম কুঠির উপর তলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন স্থাপিত হয় এবং নিচতলায় উপাচার্য দপ্তর স্থাপন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন ওসমান গনি এবং প্রথম পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত হন অধ্যক্ষ আব্দুল করিম মন্ডল। বড়কুঠির নিচতলা ছিল প্রশাসনিক ভবন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস শুরু হয়েছিল রাজশাহী কলেজ কমপ্লেক্সে। রাজশাহী শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া করা বাড়িতে গড়ে ওঠে ছাত্রাবাস। রাজশাহী কলেজ মাঠ সংলগ্ন ফুলার হোস্টেলকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে রূপান্তরিত করা হয়। বড়কুঠির লালকুঠি ভবন এবং আরেকটি ভাড়া করা বাড়িতে ছাত্রী নিবাস স্থাপিত হয়। অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে রাজশাহী কলেজের কয়েকটি কক্ষে ১৯৫৪ সালে কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের সহায়তায় উপাচার্য ডঃ ইতরাৎ হোসেন জুবেরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন এবং সরকারিভাবে যথার্থ অনুদান না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাতে চরম আর্থিক সংকটের দরুন একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৫৮ সাল থেকে ৬৪ সালের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম রাজশাহী শহর থেকে তিন মাইল পূর্বে পদ্মার অনতিদূরে মতিহারের সবুজ চত্বরে মতিহার ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত করা হয়। শুরুতে ১৬১ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে রাজশাহী কলেজ কমপ্লেক্স এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ৭১ বছরে পদার্পণ করেছে। rr

পাকিস্তান শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষার সম্প্রসারণের জন্য বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রাজশাহীতে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সম্প্রসারণ ব্যাহত হয়েছে। ভাষা আন্দোলন তৎপরবর্তী পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব পাকিস্তান রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল অচিরেই তার স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সালের ছয় দফা দাবি, ৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ সালের নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে। পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ডঃ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা স্যারকে হত্যার ফলে বাংলাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই আন্দোলনের তীব্রতা দেখে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্যদেরকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ জোহা হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ফলে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালিত হয়। ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭১বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়। এই সুদীর্ঘ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে র‍্যাংকিং এ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন বিখ্যাত র‍্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিকভাবে উচ্চস্থান অর্জন করেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে এবং শিক্ষার সম্প্রসারণের জন্য ১৯৭৩ সালের এ্যাক্ট অনুযায়ী বিভিন্ন কলেজকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাকালে অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ছিল ২০ টি। পরবর্তীতে অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২৫ টি। কিন্তু পরবর্তীতে সরকার দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যাস্ত করেন। রাজশাহীতে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ৬টি এবং বায়োসায়েন্স ৬টি এবং সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ শামসুজ্জোহা ইনস্টিটিউট অফ বায়োসায়েন্সেসকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি প্রদান করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত শহীদ শামসুজ্জোহা ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্সেস এ এগ্রিকালচার, মাইক্রোবায়োলজি এবং ফুড এন্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগে ৪ বছর মেয়াদি বি.এসসি. অনার্স ১ম বর্ষে ভর্তি কার্যক্রম চলছে।

লক্ষ-লক্ষ শিক্ষার্থীর আবেগ, অনুভূতি আর ভাবাবেগের সমস্ত জুড়ে আধিপত্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেশ,কাল , ভাষা আর সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে উঁচু মস্তকে বিশ্ব-জ্ঞানের দীপ্তি ছড়াক প্রিয় রাবি, জন্মলগ্নের শুভক্ষণে এটাই প্রত্যাশা।

মোঃ হেলাল উদ্দিন
সহযোগী অধ্যাপক
ইতিহাস বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


আরো পড়ুন